ঢাকাবৃহস্পতিবার, ১১ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের ‘নীরবতা’র সাইলেন্ট ডিপ্লোম্যাসি

আশরাফুল আজম সিজান | সিটিজি পোস্ট
ডিসেম্বর ১, ২০২৩ ৯:৫৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীরব কূটনীতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। একথা বলেছিলেন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানরা। এখন বাংলাদেশের ব্যাপারেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের নীরবতা অবলম্বন করছেন। কূটনৈতিক পরিভাষায় একে বলা হচ্ছে সাইলেন্ট ডিপ্লোমেসি। আর এই নীরব কূটনীতি যে কোনো দেশের জন্য আতঙ্কের কারণ হতে পারে বলে মনে করেন কূটনীতিক বিশ্লেষকরা।

গত দুই বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে অত্যন্ত সরব অবস্থানে ছিলেন। তারা বাংলাদেশের ব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছিলেন কোন রকম রাখঢাক ছাড়াই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে হবে এবং এই নির্বাচন হতে হবে অংশগ্রহণমূলক। স্পষ্টতই সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কূটনীতিক গত দুই বছরে বাংলাদেশ সফর করেছেন। সরকার এবং বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাসও এই সময় ছিলেন সরব।

গত বছরের ১৫ মার্চ বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি বাংলাদেশের নির্বাচন, মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অত্যন্ত সরব এবং ব্যস্ত সময় কাটান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এবারে যে নির্বাচন হচ্ছে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফর্মুলা অনুযায়ী নয়, এটা সহজেই বলা যায়। কারণ এই নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধীদলগুলো অংশগ্রহণ করছে না। কাজেই মার্কিন সংজ্ঞা অনুযায়ী এটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, একটি নির্বাচনে যদি ৪০ শতাংশ বা তার বেশি ভোটার উপস্থিতি থাকে তাহলে সেই নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক বলে বিবেচিত হবে। সেজন্যই এবারের নির্বাচন আওয়ামী লীগ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সবগুলো আসনেই ৪৫০ জনের কাছাকাছি স্বতন্ত্র আওয়ামী লীগ প্রার্থী এবার দাঁড়িয়েছেন। ফলে এবার নির্বাচনে কোথাও কেউ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন না। ভোট যুদ্ধ হবে সব আসনেই। তারপরও এই ফর্মুলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুশি কি না তা এখন পর্যন্ত অস্পষ্ট।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ নিয়ে এক ধরনের নীরবতা অবলম্বন করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যখন নিয়মিত ব্রিফিং হচ্ছে সেই ব্রিফিংয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের তাগিদ পুনর্ব্যক্ত করেছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস ছুটিতে গিয়েছিলেন। ছুটি থেকে তিনি দেশে ফেরার পর শুধুমাত্র বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সেখানে তিনি নতুন মার্কিন শ্রমনীতি নিয়ে কথা বলেছেন বলে ধারণা করা হয়। অন্য সময়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললেও এখন তিনিও নীরবতা পালন করছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি নতুন শ্রমনীতি ঘোষণা করেছেন এবং এই শ্রমনীতি ঘোষণার সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিক কল্পনা আক্তারের প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেছেন। এরপর ওয়াশিংটন থেকে পাঠানো এক বার্তায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার কমার্স এই নতুন শ্রমনীতির টার্গেট বাংলাদেশ হতে পারে এবং বাংলাদেশের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছেন৷ যদিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে যে, বাংলাদেশ শ্রমনীতির টার্গেট হবে না।

কিন্তু বিভিন্ন সূচকগুলো বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচন, গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনের প্রস্তুতি, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মামলা ইত্যাদি বিষয়গুলোর দিকে গভীরভাবে নজর রাখছে এবং এই সমস্ত নজর রাখার ফলে বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা সুস্পষ্ট এবং দৃশ্যমান অবস্থান নির্বাচনের পরপরই স্পষ্ট হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। শেষ পর্যন্ত যদি নির্বাচন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্তুষ্টমূলক না হয় তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ব্যাপারে অনেক কিছুই করতে পারে এমন শঙ্কার কথাও প্রকাশ করা হচ্ছে বিভিন্ন সময়। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতার অর্থ বুঝতে হলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচন পর্যন্ত।