ঢাকাশুক্রবার, ১২ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

একটি শোষণ মুক্ত রাষ্ট্রের সন্ধানে – মো.নিজাম উদ্দিন 

মো. নিজাম উদ্দিন | রাজনৈতিক বিশ্লেষক
নভেম্বর ২৯, ২০২২ ১:৫৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

এক.

রাজনীতি সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।রাজনীতিই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সোশাল সার্ভিস।যারা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে রাজনীতিকে এভয়েড করে তা একেবারেই অসম্ভব ঘটনা।এহেন কোনো সেক্টর নাই যা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে না।রাজনীতিই পাল্টে দিতে পারে রাষ্ট্র,সমাজ, সভ্যতা।একটা রাষ্ট্র কেমন?এর সহজ উত্তর হতে পারে -তার রাজনীতি কেমন?রাজনীতিকে সঠিক পথে না এনে রাষ্ট্রকে মেরামত করা অসম্ভব।একটা দেশের রাজনীতি কেমন?তা নির্ভর করে রাজনৈতিক দলের নেতাদের নীতি,নৈতিকতা এবং আদর্শের উপর।সেই দেশের রাজনৈতিক দল গুলোর কার্যক্রমের উপর,তাদের পলিসির উপর,তারা কী চায়,কেন চাই এর উপর।আজকের নেতারাই আগামী দিনের মেম্বার,চেয়ারম্যান,মেয়র,এমপি,মন্ত্রী,প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি।আজকের রাজনৈতিক দল গুলোই আগামী দিনের সরকার।রাজনৈতিক দল গুলোও একেকটা মিনি সরকার।ছায়া সরকারের মতো।আজকের রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের গণতান্ত্রিক চিন্তা,ভাবনা এবং চর্চার উপরই নির্ভর করে আগামী দিনের একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র।

দুই.

বর্তমান বিশ্বের গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক এবং ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দল গুলোর একটা জায়গায় ভীষণ মিল।তারা সবাই কম বেশি ‘ইজম’ ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেয়ে কল্যাণ রাষ্ট্র বা welfare state এর উপর খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।এর একটা ভালো দিক হচ্ছে মানুষকে ধর্ম,বর্ণ,ভাষা,গোত্রের দৃষ্টিতে না দেখে মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখার দৃষ্টি ভঙ্গি জোরদার হচ্ছে।দেশে দেশে এখন ইজমের পরিবর্তে ‘সমস্যা সমাধানের রাজনীতির’ আওয়াজ উঠছে।সমস্যা সমাধানের রাজনীতিই শোষণ হীন সমাজ ও রাষ্ট্রের সন্ধান দিতে পারে।এই পথ কঠিন।অনেক কঠিন।তবে অসম্ভব নয়।শোষণ মুক্ত সমাজ মানেই সমাজতন্ত্র বিষয়টা এমনও নয়।শোষণ মুক্ত সমাজ মানে ইনসাফ ভিত্তিক রাষ্ট্র। সঠিক নেতৃত্ব এবং যেকোনো রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ভালো হলে এটা অর্জন করা সম্ভব।

শোষণ মুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন একটি ইনক্লুসিভ সোসাইটি।যেখানে কেউ নিজেকে রাষ্ট্রের মালিক আর কেউ গোলাম মনে করবে না।সবাই সমান।শোষণ মুক্ত সমাজের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষা।বাংলাদেশের অনেক গ্রামে এখনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই।প্রাইমারি স্কুল নেই! অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই।গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও এমন অসংখ্য পরিবার আছে যাদের ঘর নেই।বাড়ি নেই। খাবারের ব্যবস্থা নেই।আর শিক্ষা?সে তো তাদের কাছে বিলাসিতা মাত্র।প্রান্তিক মানুষের মৌলিক চাহিদা বুঝতে পারে এমন রাজনীতি এবং নেতৃত্বই পারে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে পথ দেখাতে।রাষ্ট্রের স্বদিচ্ছা থাকলে অনেক কিছুৃই সম্ভব। রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটে যেহেতু বসে আছে রাজনীতিবিদরা, সুতরাং দায়টা রাজনীতিবিদদের অনেক বেশি।

তিন.

সমাজের একটা বড় অংশ-যারা কৃষক,শ্রমিক,নিম্ন মধ্য বিত্ত-তারা এখনো চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত। এদেশে উন্নত চিকিৎসা যেন বিলাসিতা,বড় লোকের ব্যাপার স্যাপার!চিকিৎসা ব্যবস্থা যে রকম হওয়ার কথা ছিল মানুষকে উপযুক্ত সেবা দেওয়ার মতো তার অনেক কিছুই নেই।রাষ্ট্রকে অসহায় মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেই হবে।রাষ্ট্রকে শোষণের হাতিয়ার না বানিয়ে মানুষের আশ্রয় আর ভরসার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিনত করতেই প্রয়োজন রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন।ভালো মানুষদের রাজনীতিতে আসা অনেক বেশি প্রয়োজন। যারা রাষ্ট্র সমাজ এবং সভ্যতা নিয়ে নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করবে। আম গাছ লাগিয়ে কাঁঠাল আশা করা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়।মানুষকে ভয়হীন সমাজের নিশ্চয়তা দিতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজ যেন কারো ভয়ের কারণ না হয়।সবাই যেন দেশটাকে আপন এবং নিরাপদ মনে করে।ধর্ম,বর্ণ,ভাষা এবং গোত্রের পরিচয়ে যেন কাউকে বিচার করা না হয়।এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ।যেখানে আইনের শাসন খুব জরুরী।মানুষ এখন পুলিশের কাছে যেতে ভয় পায়।থানা মানেই হয়রানি।পুলিশকে জনগণের ভরসার জায়গায় পরিনত করতে পারলে সমাজে অপরাধ অটোমেটিক কমে যাবে।আদালতে ন্যায় বিচারের নিশ্চয়তা চায় প্রতিটি মানুষ।রাজনীতির নামে লুটপাট ও দুর্নীতির প্রতিষ্ঠিত ব্যাবস্থা ভেঙ্গে চুরে নতুন সমাজ বিনির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।আর সেজন্য প্রয়োজন এমন একদল মানুষ যারা জাতিকে স্বপ্ন দেখাবে,পথ দেখাবে,নেতৃত্ব দিবে।

চার.

বাংলাদেশে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র বা শোষণ হীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সবার আগে পাল্টাতে হবে এর নীতিহীন রাজনীতিকে।লুটপাট,দুর্নীতি,দখল,গুম,খুনের রাজনীতি,ভোট ডাকাতির নির্বাচন এবং কতৃত্ববাদের গণতন্ত্র -এগুলোকে নিরাপদে রেখে একটা কল্যাণ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা আহাম্মকি ছাড়া কিছুই নয়।বাংলাদেশের মানুষের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।এই লড়াই শুধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়।ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।আজকে যারা বাংলাদেশে সুশাসন,গণতন্ত্র,আইনের শাসন এবং ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি।মানুষ বিশ্বাস করে বাংলাদেশে ন্যায়বিচার,সুশাসন এবং মানুষের অধিকার নিয়ে স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকার নতুন সূর্য উদিত হবে।

 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে,নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে,ওয়ান ইলেভেনের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে এবং যে লড়াই বাংলাদেশে এখন চলছে তার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে অনেক বড়।অনেক মহৎ।মানুষ বড় ভরসা নিয়ে বসে আছে।আজ যা হচ্ছে,আগামী দিনে তা হবে না।আজকে যারা মানুষের অধিকারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আগামী দিনে তারা বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারলেই বাংলাদেশে একটি শোষণ মুক্ত রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। কাজটা অনেক কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়।একমাত্র রাজনীতি সঠিক পথে চললে,রাজনীতিবিদরা সঠিক পথে চললেই,বাংলাদেশের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব।না হয় এক ভয়ংকর ভবিষ্যতই আমাদের নিয়তি।আগামী দিনের বাংলাদেশ সব মানুষের ভয়হীন ঠিকানা হয়ে উঠুক।

 

লেখক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক