ঢাকাশুক্রবার, ১২ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

দেউলিয়াত্বের পথে হাঁটছে মিয়ানমার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সিটিজি পোস্ট
জুলাই ২২, ২০২২ ২:২১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রিজার্ভ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে মিয়ানমারে। যেনতেনভাবে ডলারের রিজার্ভ বাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সামরিক জান্তা। এরই মধ্যে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সব ধরনের বিদেশী ঋণ পরিশোধ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শ্রীলংকার পর মিয়ানমারই এখন রাষ্ট্রীয় দেউলিয়াত্বের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে।

মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক আদেশে স্থানীয় ব্যক্তি ও কোম্পানিগুলোকে বিদেশী ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। আদেশটির মাধ্যমে বৈদেশিক লেনদেনে বর্মি কোম্পানিগুলোর প্রদেয় সব ধরনের বিল পরিশোধ আটকে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে মিয়ানমারের পক্ষে হয়তো সামনের দিনগুলোয় রাষ্ট্রীয় দায়দেনা পরিশোধ করাও অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।

তাদের ভাষ্যমতে, মিয়ানমারে মূল্যস্ফীতি এরই মধ্যে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিদেশ থেকে বিলাসপণ্যের পাশাপাশি খাদ্যপণ্য, ওষুধ ও জ্বালানি আমদানিতেও এখন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ভেঙে পড়েছে সামাজিক ব্যবস্থাও। সব মিলিয়ে মিয়ানমারের নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

 

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এরই মধ্যে মিয়ানমার ছেড়েছে বেশকিছু বিদেশী প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ দেশটি থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে জ্বালানি খাতের ফরাসি জায়ান্ট টোটাল এনার্জি। দেশটির জ্বালানি তেল ও গ্যাসে বিনিয়োগকারী দুই বিদেশী প্রতিষ্ঠান শেভরন ও উডসাইডেরও বিনিয়োগ প্রত্যাহার কার্যক্রম পুরোপুরি সম্পন্নের পথে। এমন অনেক বিদেশী প্রতিষ্ঠানই এরই মধ্যে মিয়ানমার থেকে বেরিয়ে এসেছে বা বেরোনোর পথে। এর পরও যেসব বিদেশী প্রতিষ্ঠান সেখানে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, ডলার রিজার্ভ নিয়ে বর্মি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান অবস্থানের কারণে সেগুলোর এখন মিয়ানমারে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

অর্থনীতির দুর্বিপাক মোকাবেলায় মিয়ানমারের নীতিনির্ধারকরা এখন সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন ডলার রিজার্ভ বাড়ানোর ওপর। এজন্য গত এপ্রিল থেকেই দেশটির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা কিয়াতে রূপান্তর বাধ্যতামূলক করে রেখেছে সেন্ট্রাল ব্যাংক অব মিয়ানমার (সিবিএম)। এক্ষেত্রে নিয়ম করা হয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক কার্যদিবসের মধ্যে এ আদেশ বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে ফ্রি ফ্লো রেট বাতিল করে বিনিময় হার বেঁধে দেয়া হয় প্রতি ডলারের বিপরীতে ১ হাজার ৮৫০ কিয়াতে।

 

নানা অনুরোধ ও সমালোচনার পর জুনে কমপক্ষে ১০ শতাংশ বিদেশী মালিকানার প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ নিয়ম পরিপালন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। যদিও সর্বশেষ এক আদেশে সেটিও তুলে নেয়া হয়েছে। এ আদেশের পর দেশটিতে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা চালানোর আর কোনো পথই খোলা থাকল না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

দেশটির মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা এখন অনেক বেশি। যদিও এর সরবরাহ এখন প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। সর্বশেষ গত বুধবারও মিয়ানমারের মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার দাঁড়ায় ২ হাজার ৪০০ কিয়াতে। এ অবস্থায় মিয়ানমার থেকে বৈদেশিক বাণিজ্য বা আন্তর্জাতিক কোনো লেনদেনে জড়াতে চাচ্ছে না কেউই। এ বিষয়ে এক কৃষিপণ্য রফতানিকারক সম্প্রতি মিয়ানমারের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ইরাওয়াদ্দিকে বলেন, সবচেয়ে ভালো হলো এখন এ ধরনের কোনো লেনদেন না করা। কারণ এখানে ব্যবসায়িক লেনদেন করা মানেই বড় ধরনের লোকসান। দেশটায় এখন আর ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, একেবারেই নেই।

স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারভিত্তিক কোম্পানিগুলোর বিদেশী ঋণ রয়েছে অন্তত ১২০ কোটি ডলার। এর মধ্যে যেসব কোম্পানির সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে টেলিকম কোম্পানি উরেদু মিয়ানমার লিমিটেড, আবাসন খাতের সিটি স্কয়ার কমার্শিয়াল কোম্পানি, টেলিকম টাওয়ার প্রতিষ্ঠান অ্যাপোলো টাওয়ারস মিয়ানমার লিমিটেড ও ইরাওয়াদ্দি গ্রিন টাওয়ারস লিমিটেড।

 

মিয়ানমারভিত্তিক উদ্যোক্তারা বলছেন, সিবিএমের খামখেয়ালিপূর্ণ এসব আদেশ এখন দেশটিতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালানোই কঠিন করে তুলেছে। কিছুদিন পরপর এ ধরনের আদেশ দেয়া হচ্ছে। আবার এসব আদেশ পালনের জন্য ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি গ্রহণেরও সময় দেয়া হচ্ছে না। অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা কিয়াতে রূপান্তর করতে গিয়ে তাদের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। কিয়াতে রূপান্তরের জন্য তারা অর্জিত প্রতিটি ডলার রূপান্তর করছেন ১ হাজার ৮০০ কিয়াতে। যদিও প্রয়োজনের সময় তাদের প্রতি ডলার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার কিয়াতেরও বেশিতে। এ অবস্থায় নেহাত প্রয়োজন না পড়লে বৈদেশিক বাণিজ্যসংশ্লিষ্টরা এখন বৈদেশিক কোনো ধরনের লেনদেনে যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন।

বর্মি সামরিক জান্তা গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই কিয়াতের বিনিময় হার ব্যাপক গতিতে কমছে। ক্ষমতা দখলের পর সামরিক জান্তা ব্যাংক ও এটিএম বুথ থেকে অর্থ উত্তোলন সীমিত করে দেয়। এর মধ্যেই আবার রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক দুর্বিপাকের কারণে কিয়াতের অবমূল্যায়ন আরো ত্বরান্বিত করে তোলে।

গত বছর দেশটিতে কভিডের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকার ধারণ করে। ওই সময় দেশটিকে বিপুল পরিমাণে মেডিকেল অক্সিজেন ও ওষুধপথ্য আমদানি করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি সিবিএমও খোলাবাজারে বিপুল পরিমাণে ডলার বিক্রি করেছে। আগস্টে সিবিএম নিয়ন্ত্রিত ফ্লোটিং রেট বাতিল করে স্থির বিনিময় হারের ভিত্তিতে কিয়াতের পতন ঠেকানোর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। বরং কিয়াতের ধস আরো গতিশীল হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে কার্ব মার্কেটে প্রতি ডলারের বিনিময় হার গিয়ে ২ হাজার ৭০০ কিয়াতে ঠেকে। চলতি বছরের মার্চে ডলার বিক্রি বন্ধ করে দেয় সিবিএম। যদিও আগের এক বছরের মধ্যে প্রায় ৫৩ কোটি ডলার বিক্রি করে ফেলেছে সিবিএম।

এরপর এপ্রিলে সিবিএমের পক্ষ থেকে আদেশ জারি করা হয়, স্থানীয়দের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা হাতে আসার এক কার্যদিবসের মধ্যে কিয়াতে রূপান্তর করতে হবে। এছাড়া ডলারের বহির্মুখিতা নিয়ন্ত্রণে সামরিক জান্তার পক্ষ থেকে জ্বালানি, ভোজ্যতেল, ওষুধ ও বিলাসপণ্য আমদানি কমানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়।

রফতানি ও আমদানি লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রেও শুরু হয় ব্যাপক কড়াকড়ি।

এছাড়া এতদিন দেশটিতে চীন ও থাইল্যান্ড সীমান্ত হয়ে বাণিজ্যের জন্য যথাক্রমে ইউয়ান ও বাথ ব্যবহারের অনুমতি ছিল। সম্প্রতি সেটিও ডলারে করতে হবে বলে নেপিদোর পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে এক অর্থনীতিবিদের বক্তব্য হলো মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এখন ডলারের সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠেছে। যদিও এ নিয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত কোনো পরিকল্পনা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। যদি বিষয়টি এভাবে চলতে থাকে, এখানে কোনো বিদেশী বিনিয়োগ তো আসবেই না; বরং যেগুলো আছে সেগুলোও দ্রুত চলে যাবে। এরই মধ্যে তা শুরুও হয়েছে। সে হিসেবে এখানকার অর্থনীতি আরো খারাপ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, এক্ষেত্রে এটি বলাই সমীচীন হবে, বিদেশী ঋণ পরিশোধের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার অর্থ হলো দেউলিয়াত্বের একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। পরিস্থিতি যদি আরেকটু খারাপের দিকে যায়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই মিয়ানমার দেউলিয়া হয়ে পড়তে যাচ্ছে।

কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ডলারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় উদ্দেশ্য হলো যেনতেন প্রকারে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা। গণতন্ত্রপন্থী ও জাতিগত বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনী স্থল আক্রমণের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সুবিধা করে উঠতে পারেনি। এজন্য সাম্প্রতিক সময়ে বিমান হামলার ওপর বেশি জোর দিচ্ছে সামরিক জান্তা। এ বিমান হামলা অব্যাহত রাখতেও তাদের উড়োজাহাজে ব্যবহার্য জ্বালানি তেল প্রচুর পরিমাণে কিনতে হবে আর তা শুধু ডলারেই কেনা সম্ভব।